মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রিয় হাসু আপা…


এপ্রিল ১৯ ২০২০

অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম

নতুন ভোরের সূর্যটা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। দীর্ঘ অনেকটা সময়  সরকারি/ বেসরকারি/এনজিও/ পেশাজীবী নানাভাবে এ দেশের মায়েদের জন্য কাজ করে গেলেও আপনাকে এভাবে লিখব ভাবিনি। আজ মনে হচ্ছে এটা আমাদের দায়িত্ব। আমরা অনেক সংকটকালে ’৬৬-এর গণঅভ্যুত্থানে একসঙ্গে কাজ করেছি, বালু-সুরকি দিয়ে বকশীবাজার ইডেন ইন্টারমিডিয়েটে শহীদ মিনার করার কাজ করেছি আপনার সংসদে, আমি আপনার ভীষণ প্রিয়জন ছিলাম- হরিহর আত্মা ছিলাম আপনার বোন ফরিদা শেখ জেলীর। জীবনের সেই চরিত্রটা আমার ভীষণভাবে মুখস্থ এবং স্মরণীয়। আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আমরা হেঁটেছি, ক্রান্তিকাল বলে আমাদের কিছু ছিল না। সব সমস্যার সমাধান করা সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া- কঠিন সময়ে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার একটা ব্রত ছিল আপনার।

মোনায়েম খান যখন ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’ ‘কে ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে’ করলেন- আপনি আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন কলেজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে তার প্রতিবাদে বক্তৃতা করার জন্য। মঞ্চ থেকে নেমে আপনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আপনার পর আমি ভিপি হলাম। আমাদের কলেজের একটা ভালো কাজ করার অঙ্গীকারে সব সময় এক ছিলাম। সেই দিনগুলো আজ আমাকে ভীষণ পীড়া দেওয়ায় আমি সোজা কথায় বলতে চাই- এমন ক্রান্তিলগ্নে আপনিই পারবেন হাল ধরতে।আপনি আপনার গণভবনের জানালা খুলে দেখুন আকাশ আজ হাসছে, যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে কোনো বিমানের শব্দ নেই আকাশে, নেই পাহাড়ের বুকে আঘাত, সমুদ্র হাসছে, তার সঙ্গে ডলফিন নেচে বেড়াচ্ছে। আপনার গণভবনের গাছগুলো দেখেন সবুজ হয়ে আছে।

মানুষ কাঁদছে। মৃত্যুর মিছিল পৃথিবীজুড়ে। পৃথিবীর সবার কষ্টটাকে সমান করে দিয়েছে। বরিস জনসন থেকে আমাদের সখিনা/দুলাল সবার গলার ব্যথা একই রকম। এমন একটা শক্তি পৃথিবীর ২১০টি দেশের মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী সরকার যারা স্কুলের বাচ্চার হাতেও বন্দুক তুলে দিয়েছিল- তারাও আজ হতভম্ব!

আজকের এই সময়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আপনি একটি আহ্বান জানান- আমরা এ শক্তির বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই। যুদ্ধের সামনের সৈনিক আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী- ডাক্তার, নার্স, মিডওয়াইফ, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রাঁধুনি সবাই। সঙ্গে আছেন মিডিয়াকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই।

প্রাথমিকভাবে কোথায় কী হয়েছিল, কেন কিছু হয়নি, এখন তিন মাস পর এগুলো নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে।

আপনি একটা কথা বলে শেষ করুন- আমরা এ যুদ্ধে সবাই সৈনিক- আমরা জিতব।

বাংলাদেশে অর্ধেক নারী, তাদের মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় সন্তান জন্ম হচ্ছে ৪০০-এর অধিক। যদি বাড়িতেও হয় তার পরও অর্ধেক হচ্ছে কমিউনিটি লেভেল থেকে উচ্চ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো পর্যন্ত। জন্ম কখনো থেমে থাকে না।

করোনা ঘোষণার অনেক আগেই সকল পর্যায়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা (মিডওয়াইফ, নার্স, ডাক্তার) সবাই- কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করেনি কে পজিটিভ, কে নেগেটিভ। তারা কাজ করে যাচ্ছে কেউ পিপিই চায়নি। আমরা কোনোরকম ব্যবস্থা করে দিয়েছি। অনেক পরে তারা কিছু কিছু পাচ্ছে। আমাদের অভিযোগ নেই। আমরা মায়েদের রক্ষা করতে চাই। কিন্তু নিজেদের সুরক্ষায় তাদের জন্য কিছু করতেই হবে। মা-নবজাতককেও রক্ষা করতে হবে। কাজটি হচ্ছে- আমরা করছি। ডাক্তার/নার্সদের জীবন ভীষণ কঠিন। আমাদের অনেকে কাঠখড় পুড়িয়ে মাত্র ৫০০-৬০০ ডাক্তার একটা পর্যায়ে এসেছে। ১৮ কোটির দেশে ১ লাখের কম আমাদের ডাক্তার সৈনিক তারা অনেক কাজ করে, না খেয়ে-আধাবেলা খেয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে; সেই গল্প আমরা এখন বলব না। পৃথিবীর সব দেশেই তাদের দুই হাত জোড় করে আলাদা বাণী শুনিয়েছে- দুই হাত একসঙ্গে করে বলেছে, ঈশ্বরের পরেই তোমাদের স্থান।

আমি কোনো পরিসংখ্যান দিতে চাই না। আপনি সেগুলো সঠিক জায়গা থেকে অবশ্যই পাবেন। শুধু এটুকু বলি, সব ক্ষেত্রের অক্ষমতাকে দুই হাতে সরিয়ে আপনি দুর্নীতির বেড়াজাল ভেঙে জাতির পিতার মতো বজ্র কণ্ঠে আর একবার বলুন- আমরা আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে এ যুদ্ধে জয়ী হবই।

আমাদের তরুণ ডাক্তাররা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- তারা আপনার ¯েœহের কাঙাল, তাদের দৃঢ়চেতা নির্ভীক মন আমাদের শক্তি জোগায়। নার্স, মিডওয়াইফ খাবার না খেয়েও নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে যেখানে হিমশিম খাচ্ছে আসুন আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই।

কর্তাব্যক্তিদের একবার বলুন যেমন করে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘তোমরা কার পয়সায় ওখানে বসেছ’- আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে বলুন। জনতার রোষ আমলাতন্ত্রকে ভাসিয়ে দিতে পারে। লাল ফিতার রং প্রয়োজনে বদলে এর চরিত্র বদলে দিন।

আপনি আমাদের সাহস দিন-

হাসু আপা আমরা জিতব- এ দেশের মানুষ এ মুহূর্তে আপনাকে ভীষণভাবে মনে করে ত্রাণকর্তা হিসেবে। আপনি আমাদের কভিড-১৯ যোদ্ধাদের একবার হাসিমুখে বলুন, আমি আছি তোমাদের সঙ্গে- তোমরা এগিয়ে যাও।

এই মুহূর্তে-

১। আগামী তিন মাস আপনি দুটি করপোরেট হাসপাতাল দুই মাসের জন্য ধরে নিন। সেখানে সরকারি/বেসরকারি সবাই সমন্বয় হয়ে One Step Umbrella হয়ে কাজ করবে। সময়ও কম লাগবে। আপনার আদেশ-আবদার-নির্দেশ কারও উপেক্ষা করার সাহস আছে বলে আমরা মনে করি না।

২। সব Virologist-কে একটা কমিটি করতে বলুন।

৩। সব Critical Medicine (অ্যানেসথেসিয়া/রেসপেরেটরি মেডিসিন, মেডিসিন পালমোনালজিস্টের) একটা কমিটি করে দিন।

৪।  Brigade/Team করতে হবে। একটা টিম দুই সপ্তাহ কাজ করার পর তাকে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে Next Team রেডি থাকবে, কেন্দ্রীয় কমান্ড তা করবে।

৫। ডাক্তারদের ১৪ দিনের রোস্টার ডিউটি, অতঃপর ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন। ডিউটির সময় স্বাস্থ্যকর্মীর হাসপাতালেই কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বরাদ্দ বাসায় থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডাক্তারদের যাতায়াতব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করতেই হবে। প্রয়োজনে নিকটস্থ হোটেল/রিসোর্টে তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। প্রতিটি জেলায় করোনা সেন্টার থাকতে হবে। পিসিআর না হোক অন্তত র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্টের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৭। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফ্লু কর্নার থাকতে হবে।

৮। বেশিসংখ্যক ডাক্তারকে আইসিইউ-এ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অতিসত্বর ট্রেনিং দিতে হবে।

৯। ইমারজেন্সি ট্রিটমেন্ট সব হাসপাতালে নিশ্চিত করতেই হবে, এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র অনিয়মের অভিযোগ মানা যাবে না। তা নাহলে কভিড-১৯-এর চেয়ে ননকভিড রোগীর মরটালিটি ও মরবিডিটি বাড়বে।

১০। দেশবরেণ্য ১০ জন সিনিয়র এবং তরুণ চিকিৎসকদের প্রতিনিধি ১০ জন, মোট ২০ জন চিকিৎসক একসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে করোনা সংক্রমণ, প্রতিরোধ পরিকল্পনা, বৈদেশিক ওষুধ আমদানি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসকদের সত্যিকারের দায়িত্ব ও সেবা সম্পর্কে আলোচনা অত্যাবশ্যক হয়ে গেছে।

১১। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রতিটি হাসপাতালের এবং করোনা হাসপাতালের রুট লেভেলের ডাক্তারদের কানেক্ট করে তাদের ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্স এবং প্রতিনিয়ত তারা কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলো জানতে হবে, সমাধানও দিতে হবে।

১২। স্বাস্থ্যকর্মীদের উৎসাহ দিতে হবে (টেলিভিশন ও সংবাদপত্র বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে) এবং ডাক্তার, নার্স, স্বেচ্ছাসেবীদের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

১৩। সরকারের বিরুদ্ধে গুজব রটনাকারীর যেমন শাস্তি হয়, তেমনি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গুজব রটালে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

১৪। পুলিশ, প্রশাসন, আর্মি, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবীরা যেন সকল পর্যায়ের চিকিৎসাকর্মীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

১৫। জনগণকে মানবিক ও সহানুভূতিশীল হতে আহ্বান জানাতে হবে। যাতে ফ্লুর রোগী, করোনার রোগী ও ডাক্তারদের সামাজিকভাবে দূরে ঠেলে না দেয়। এবং দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো সরকার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।

১৬। তাদের আনন্দময় কিছু মুহূর্ত – সংগীতশিল্পীরা দেবেন।

– আমরা ১৮ কোটি মানুষ ৩৬ কোটি হাত জোড় করে একসঙ্গে বলব- কভিড-১৯ বীর যোদ্ধারা! তোমাদের জন্য আমরা আছি তোমাদের পাশে।

ব্যর্থতার সব দায় আমরা যারা করছি তারা মাথায় নিয়ে বলছি, আপনি হুকুম দিন- আবার ’৭১-এর মতো।

‘আমরা করব জয়’ গানটা আপনার সঙ্গে গাওয়ার ইচ্ছা রেখেই বলছি- রাত এখন গভীর ভোরের উজ্জ্বল সূর্য শুভবার্তার হাতছানি নিয়ে আপনাকেই ডাকছে।

আমরা সবাই আবার গাইব-

‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে

এ জীবন পুণ্য করো এ জীবন পুণ্য করো

এ জীবন পুণ্য করো দহন দাহে।’

আপনার স্নেহধন্য

অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম

সাবেক সভাপতি, ওজিএসবি।

Email : [email protected]

Courtesy: Bangladesh Pratidin

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২৬৬,৪৪৫
সুস্থ
১৫৩,০৮৬
মৃত্যু
৩,৫১৩

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৯৯৫
সুস্থ
১,১১৭
মৃত্যু
৪২
সূত্র: আইইডিসিআর

ভাষা সৈনিক চিকিৎসক

নিউজ

মুক্তমত

সংগঠন

হাসপাতাল