চিকিৎসকদের ভুল বুঝবেন না


এপ্রিল ২৫ ২০২০

ডা. রাশিদা বেগম

আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক। অত্যন্ত বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, বর্তমান করোনা দুর্যোগের বিষয়ে কিছু তথ্য আপনার কাছে হয়তো সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি, যে কারণে প্রাথমিকভাবে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যাপক উৎসাহ প্রদান, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও প্রণোদনার কথা বললেও আপনার গত ৭ এপ্রিলের বক্তব্যে ডাক্তারদের প্রতি অসন্তোষ, হতাশা ও কিছুটা উষ্মা প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্বের সব কথিত উন্নত রাষ্ট্রের প্রচণ্ড দুশ্চিন্তার কারণ সৃষ্টিকারী একটি মরণঘাতী ও সাংঘাতিক ছোঁয়াচে রোগের চিকিৎসা কাছে থেকে দেয়া এমনিতেই ভীষণ মানসিক চাপের বিষয়। আইসিইউতে একজন মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চাপই অপরিসীম। এর সঙ্গে যোগ হয় নিজের ও পরিবারের বেঁচে থাকার চাপ।

সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা চেম্বার (আনডায়াগনোজড ক্যারিয়ার বা অনির্ণীত রোগবাহকের জন্য)- সব ক্ষেত্রেই কিছু চাপ থাকে। সমাজের কিছু মানুষের তীব্র সমালোচনায়ও মনের ওপর চাপ পড়ে। তাই এ দুঃসময়ে প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র অভিভাবক, যার অভয় বাণী আর উৎসাহ না পেলে চিকিৎসকরা ভেঙে পড়তে পারেন।

দুটি বিষয়ের ব্যাখ্যা

১. প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে কেউ পালায়নি। বরং চেম্বার বন্ধ থাকায় তা রোগী থেকে রোগীতে, রোগী থেকে ডাক্তারে এবং ডাক্তার থেকে অজস্র রোগীতে সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক হয়েছে।

অনেকের শুধু যে আয় বন্ধ তা নয়, অনেকে বৃহদাকার স্থাপনার খরচের বোঝা মাথায় নিয়ে চেম্বার বন্ধ রেখেছেন। তাতে রোগীদের অসুবিধা হলেও এ দুর্যোগে অনেকে বিকল্প ব্যবস্থার শরণাপন্ন হচ্ছেন। যখন যার দরকার টেলিফোন, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ নিচ্ছেন।

বুঝদার রোগীরা নিজেরাই ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। যত কম বের হবেন, চেম্বারে আসবেন, ততই মঙ্গল। আরেকটা কথা। চেম্বারে কিন্তু চিকিৎসা দেয়া হয় না, চিকিৎসাপত্র লেখা হয়। যেটা আমরা এখন বিভিন্নভাবে দিয়ে আসছি।

বেশি অসুবিধা যার হবে, সে ইমারজেন্সিতে আসবে। তাই সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ থাকা বাঞ্ছনীয়। বিশ্বের অনেক দেশ এ নিয়ম অনেক আগেই চালু করেছে, যদিও ওসব দেশে বহির্বিভাগে রোগীর চাপ আমাদের এক-পঞ্চমাংশও নয়।

চিকিৎসক রিজার্ভ (যুদ্ধের মাঠে রিজার্ভ ফোর্সের মতো) রাখারও একটা ব্যাপার আছে। সবাইকে একসঙ্গে এক্সপোজড করলে চিকিৎসক সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ, কেউ অসুস্থ থাকবে, কেউ কোয়ারেন্টিনে থাকবে।

তথ্য গোপন করা কোভিড-১৯ রোগীদের কারণে অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ইতোমধ্যে কোয়ারেন্টিনে আছেন। তাই বহির্বিভাগ বন্ধ এবং ইনডোরেও ভাগ করে রোস্টার করে ন্যূনতম চিকিৎসক দিয়ে কাজ চালানো জরুরি।

২. কয়েকজন রোগী দ্বারে দ্বারে ঘুরে মৃত্যুবরণ করেছেন- ডাক্তার সমাজ সে জন্য যারপরনাই দুঃখিত। কিন্তু এ দ্বারে দ্বারে ঘোরার জন্য দায়ী ব্যবস্থাপকরা। শুরু থেকে করোনা রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। একটি মাত্র জায়গায় করোনা টেস্টের ব্যবস্থা থাকায় সন্দেহভাজন কোভিড-১৯ রোগীরা যখন যে হাসপাতালেই গেছে, তাদের টেস্টের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না।

ডেজিগনেটেড করোনা হাসপাতাল পজিটিভ না হলে রোগী নেবে না। কারণ, নেগেটিভ হলে রোগী ওখানে ঢুকে অন্য পজিটিভ রোগীর মাধ্যমে ইনফেক্টেড হতে পারে। অপরদিকে, অন্যান্য হাসপাতাল পজিটিভ হলে নেবে না। কারণ, সে অন্য অনেক রোগীকে ইনফেক্টেড করতে পারে।

সব হাসপাতালে এখনও টেস্টিংয়ের ব্যবস্থা নেই। আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন জোনে ভাগ করা নেই। তাহলে সন্দেহভাজন রোগীকে কীভাবে ভর্তি করা হবে? এখনও বিভিন্ন জায়গায় করোনা রোগী তথ্য গোপন করে ঢুকে যাচ্ছে অন্য রোগীর মধ্যে। প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে। ফলাফল- সব এক্সপোজড স্বাস্থ্যকর্মী কোয়ারেন্টিনে। ডাক্তার ও রোগী উভয়েই এসব অব্যবস্থাপনার শিকার।

ভাইরাসকে এয়ারপোর্ট দিয়ে অবাধে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই ভাইরাস এখন সারা দেশে। এর দায় বহন করতে হবে চিকিৎসককে? যেখানে টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতালে আইসিইউ নেই, সেখানে ডাক্তারদের আর কী করার আছে?

পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর নেই, থাকলেও বিকল। চালানোর মতো পর্যাপ্ত সুদক্ষ জনবল তৈরিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ তৈরির রাস্তা সংকুচিত করে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে ভালনারেবল। আক্রান্তদের একটি উলে­খযোগ্য অংশ ডাক্তার। বেশ কয়েকজন ডাক্তার আক্রান্ত, কেউ কেউ আইসিইউতে। মারা গেছেন একজন ডাক্তার এবং একজন স্বাস্থ্যকর্মী।

স্বাস্থ্যকর্মীরা ভাইরাসের ডিপোর মধ্যে থাকেন। তাদের রিপিটেড এক্সপোজারে ভাইরাল লোড অনেক বেশি থাকে। তাই তাদের ঝুঁকির সঙ্গে অন্য কারও ঝুঁকির তুলনা চলে না। তাদের নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে তারা কাজ করবেন কীভাবে?

যথাযোগ্য পিপিই সব করোনা রোগীর সেবকদের কাছে থাকা বাঞ্ছনীয়। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেরই যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির লোকজনও তাদের কারণে ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার সুবিধাদি না দিলে সার্ভিস ব্যাহত হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী না বাঁচলে কেউ বাঁচবে না।

সমাজে সব পেশার মানুষের মধ্যেই ভালো-মন্দের উদাহরণ আছে। কোনো কোনো ডাক্তারেরও নানারকম নেতিবাচক বিষয় থাকতে পারে; কিন্তু এমন কোনো ডাক্তার নেই যিনি রোগীর জীবনের জন্য যুদ্ধ করেন না। কাউকে বাঁচানোর সামর্থ্য না থাকলেও ডাক্তাররাই শেষ রক্ষাকবচ। তাদের একটু বিবেচনায় রাখুন।

একজন দক্ষ ডাক্তার হতে বহু সাধনা, বহু ত্যাগ আর বহুদিনের অভিজ্ঞতার দরকার হয়। ওদের আমরা যেন মনে ও শরীরে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।

তাই ভেতরের প্রকৃত খবর জানার জন্য এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনের লোক নয়, প্রশাসনিক ডাক্তারও নয়, যারা মাঠপর্যায়ে রোগীর চিকিৎসা করেন, তাদের কথা দয়া করে কান পেতে শুনুন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ফ্রন্ট ফাইটারদের একমাত্র ও শেষ ভরসা আপনিই। ডাক্তার রোগীদের বাঁচাতে চায়, নিজেও বাঁচতে চায় পরিবার-পরিজন নিয়ে। এ আপৎকালীন প্রচণ্ড সমন্বয়হীনতার মাঝে আপনার দ্রুত যুক্তিযুক্ত হস্তক্ষেপ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রলয় কমিয়ে আনবে নিশ্চিতভাবেই। সেই বিশ্বাস বুকে নিয়েই আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম : চিফ কনসালট্যান্ট, ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার; ট্রেজারার, অবস্টেট্রিক্যাল আন্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২৬৬,৪৪৫
সুস্থ
১৫৩,০৮৬
মৃত্যু
৩,৫১৩

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৯৯৫
সুস্থ
১,১১৭
মৃত্যু
৪২
সূত্র: আইইডিসিআর

ভাষা সৈনিক চিকিৎসক

নিউজ

মুক্তমত

সংগঠন

হাসপাতাল