প্রাণ হারাচ্ছেন সম্মুখযোদ্ধারা


মে ২ ২০২০

করোনায় আক্রান্ত হয়ে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দুই সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। তার একজন এএসআই আবদুল খালেক। অন্যজন কনস্টেবল আশেক মাহমুদ। এর আগে মারা যান কনস্টেল জসিম উদ্দিন। এ নিয়ে দুই দিনে করোনায় পুলিশের তিন সদস্যের মৃত্যু হলো। দৈনিক সময়ের আলোর নগর সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকন মারা যান গত মঙ্গলবার রাতে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দিন মারা যান ১৫ এপ্রিল। তিনি ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা মুজতবা শাহরিয়ার প্রাণ হারান এ ভাইরাস আক্রান্তে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যারা সামনে থেকে কাজ করছেন, সেসব সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সাংবাদিক আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। এদের আক্রান্ত হওয়ার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। মৃত্যুর এমন ঝুঁকি নিয়েই করোনা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছেন যোদ্ধারা।নভেল করোনাভাইরাসের তা-বে গোটা পৃথিবী এখন ল-ভ- হওয়ার পথে। এর প্রভাবে দেশের অর্থনীতিসহ জীবনযাত্রা থমকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ যারা ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখসারিতে কাজ করছেন, সবার আগে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নভেল করোনাভাইরাস আক্রান্তদের সেবায় বা এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ফ্রন্টলাইনে যারা কাজ করছেন, তাদের সুরক্ষার বিষয়টি বলতে গেলে এখনো উপেক্ষিত। যে কারণে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সংবাদকর্মীসহ যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন, তাদের একটি বড় অংশ এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, ফ্রন্টলাইন কর্মীদের মৃত্যুর তালিকাও লম্বা হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাধারণ সম্পাদক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, এখন হাসপাতাল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। এজন্য হাসপাতালে ‘ট্রায়াজ’ পদ্ধতি চালু করা জরুরি ছিল। এ পদ্ধতিতে সবুজ জোনে স্বাভাবিক রোগী, হলুদ জোনে সন্দেহভাজন রোগী এবং লাল জোনে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হতো। তাহলে রোগী থেকে ডাক্তার কিংবা ডাক্তার থেকে রোগীতে করোনা সংক্রমিত হতো না।

পুলিশ সদর দফতরসূত্র জানান, এ পর্যন্ত পুলিশের ৪ শতাধিক সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ডিএমপিতে ২৪০। কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১ হাজার ২৬ জন। পুলিশের তিনজন মৃত্যুবরণ করেছেন। সর্বশেষ গতকাল দুই পুলিশের মৃত্যু হয়।

গতকাল এক ভিডিওবার্তায় পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা জানান, পুরো পুলিশ পরিবার মৃতদের পরিবারের পাশে রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বাহিনী। আমরা তাদের কল্যাণ ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

আবদুল খালেক মিরপুরে পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি একাডেমির মসজিদে ইমামতি করতেন। গতকাল ভোরে আরামবাগের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দুই মেয়ে ও এক ছেলের বাবা আবদুল খালেকের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলায়। আশেক মাহমুদ রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২৬ এপ্রিল অসুস্থতা বোধ করায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এক দিন পরই তার দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় বলে জানান ঢাকা মহানগর উত্তরের (ট্রাফিক) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) বদরুল হাসান।

আশেক মাহমুদ রাজারবাগ ট্রাফিক ব্যারাকে থাকতেন। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহে। তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়। সূত্র জানান, এখন পর্যন্ত ডিএমপির ২৬৩ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। সারা দেশে এ সংখ্যা ৪০০-এর বেশি।

গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনস্টেবল জসিম উদ্দিনের মৃত্যুতে প্রথম কোনো পুলিশ সদস্য করোনায় মারা যান। জসিমের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচংয়ে। ওয়ারী ফাঁড়িতে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি করোনায় সংক্রমিত হন। এর আগে আরও এক পুলিশ সদস্য মৃত্যুবরণ করেন।

চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে প্রাণ গেছে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দিনের। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে মারা যান একজন স্বাস্থ্যকর্মী। জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে ৩৯২ জন চিকিৎসক, ১৯১ জন নার্সসহ ২৯৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৮৮১ জন স্বাস্থ্যকর্মী সেবা দিতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।

৩৯ সংবাদকর্মী আক্রান্ত, মৃত ১ : কয়েক দিন ধরেই করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) বারবার ফোন দিলেও প্রাথমিকভাবে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে সাংবাদিকরা চাপ দিলে ওই সাংবাদিকের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নমুনা নেওয়ার দুই দিন পর গত বুধবার রাতে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার নম্বর থেকে রোগীকে এসএমএস করে করোনা পজিটিভ বলে জানানো হয়।

দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদের এই সাংবাদিকসহ এখন পর্যন্ত ৩৯ জন গণমাধ্যমকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে দৈনিক সময়ের আলোর নগর সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকন মঙ্গলবার রাতে মারা যান। তবে আক্রান্তের মধ্যে আটজন সাংবাদিক ইতিমধ্যে সেরে উঠেছেন।

সেরে ওঠা সাংবাদিকরা হলেন- বেসরকারি টেলিভিশন ইনডিপেনডেন্ট টিভির ক্যামেরাপারসন, যমুনা টিভির রিপোর্টার, দীপ্ত টিভির একজন, এটিএন নিউজের রিপোর্টার, যমুনা টিভির নরসিংদী প্রতিনিধি, একাত্তর টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি, বাংলাদেশের খবরের রিপোর্টার ও দৈনিক সংগ্রামের একজন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন বেসরকারি টিভি চ্যানেল দীপ্ত টিভির সংবাদকর্মীরা। এ কারণে ওই অফিস লকডাউন করা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে সংবাদ বিভাগ। বিশেষ ব্যবস্থায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

Source: Bangladesh Pratidin

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২৬৬,৪৪৫
সুস্থ
১৫৩,০৮৬
মৃত্যু
৩,৫১৩

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৯৯৫
সুস্থ
১,১১৭
মৃত্যু
৪২
সূত্র: আইইডিসিআর

ভাষা সৈনিক চিকিৎসক

নিউজ

মুক্তমত

সংগঠন

হাসপাতাল