পরাজিত করতে হলে ভাইরাসকে জানতে হবে


মে ১০ ২০২০

সমীর সাহা, অণুজীববিজ্ঞানী

নতুন করোনাভাইরাস সম্পর্কে যত জানব, তত নিরাপদ থাকব। শত্রুকে পরাজিত করতে হলে তাকে চিনতে হবে।

২০০২ সালে সার্স-করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। সে সময় আক্রান্ত ৮ হাজার মানুষ শনাক্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিল ৮০০ মানুষ। মৃত্যুহার ছিল ১০ শতাংশ। ওই ভাইরাস বাদুড় থেকে প্রথমে সিবেট নামের ছোট্ট প্রাণীর দেহে যায়। সিবেট থেকে মানুষে।

২০১২ সালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্স-করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। এই ভাইরাস বাদুড় থেকে উটে গিয়েছিল। উট থেকে মানুষের শরীরে। আড়াই হাজার আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিল ৮৫০ জন। মৃত্যুহার ছিল ৩৪ শতাংশ।

২০১৯ সালে দেখা দিল নতুন ভাইরাস। এটিও বাদুড় থেকে প্রথমে কচ্ছপের মতো প্রাণী প্যাঙ্গোলিনে যায়। প্যাঙ্গোলিন থেকে এটা মানুষে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত্যুহার ৩ শতাংশ বলা হলেও তা বাড়িয়ে বলা হবে। কারণ, আক্রান্ত অনেকেই চিহ্নিত হচ্ছেন না। তবে মৃত্যুহার ১ বা ১.৫ শতাংশ ধরে নেওয়া যায়।

ছোট এই ভাইরাসের কাছে সবাই পরাজিত। সমস্যা হচ্ছে, এটি অতি দ্রুত ছড়ায়। মানুষের শরীরে ছাড়া এই ভাইরাস এক থেকে দুই দিন বাঁচতে পারে। এটা বাতাসে ছড়ায়। তবে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বেশি ছড়ায়। টেবিল, দরজার হাতল, মুঠোফোন, কম্পিউটারের কি-বোর্ড থেকেও তা মানুষে সংক্রমিত হতে পারে।

এখন কথা হলো, এই ভাইরাসের কাঠামো কেমন? চরিত্র কী? যদি এটা আমাদের না মারত, তাহলে এটা দেখে মনে হতো, আহা, এ তো ফুলের মতো বা এ তো কানের দুলের মতো।

ভাইরাসটির ওপর স্পাইক আছে। স্পাইক হচ্ছে এস প্রোটিন। আমাদের কোষে এসিই-২ প্রোটিন আছে। আমাদের এসিই-২ প্রোটিনকে সে রিসেপ্টর হিসেবে ব্যবহার করে। সেখানে একটির পর একটি স্পাইক লেগে যায়। এরপর তা আমাদের কোষে ঢোকে। এই স্পাইক ফিউরিন প্রোটিনকে বেশি পছন্দ করে। ফিউরিন প্রোটিন থাকে আমাদের শ্বাসতন্ত্রে, আমাদের ফুসফুসে। তাই এই ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রে বাসা বাঁধে। অন্য ভাইরাস রক্ত বা অন্য কোথাও চলে যায়, কিন্তু করোনাভাইরাস ওখানেই থেকে যায়। এরপর সে আমাদের কোষের ভেতরে ঢুকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।

আস্তে আস্তে ফুসফুস দুর্বল হয়, কার্যক্ষমতা হারায়। ফ্লুইড এসে ফুসফুসে জমা হয়। আমাদের জ্বর হয়, শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা হয়। এর প্রভাব পড়ে হৃৎপিণ্ডে, যকৃতে, কিডনিতে। হয়তো ঢুকেছিল একটা ভাইরাস। পরে অসংখ্য কপি হয়ে তারপর বের হয়।

সাধারণভাবে এরা স্বাধীনভাবে এক থেকে দুই দিন বাঁচতে পারে। ওরা বাঁচে আসলে আমাদের শরীরে। এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়ায়। সুতরাং আমাদের দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ কিছু দেশ ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। অনেক দেশ ছড়িয়ে পড়ার কথা চিন্তাই করেনি, তাই নিয়ন্ত্রণের পথে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম সংক্রমণ শুরু হয়। তারা গুরুত্ব দিয়েছিল, নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু নিউইয়র্ক শুরুতে গুরুত্ব দেয়নি। তারা মূল্য দিচ্ছে।

ভাইরাসটির সংক্রমণের ধারা-রেখার একটি হচ্ছে পিক (উচ্চ শিখর), অন্যটি হচ্ছে ফ্ল্যাট (সমতল)। ইতালি, ফ্রান্স পিকের উদাহরণ। আর ফ্ল্যাটের উদাহরণ হচ্ছে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু আমরা আমাদের রেখাটি জানি না, দেখতে পারছি না। আমাদের পরীক্ষা হচ্ছে সীমিত পর্যায়ে। এখন ‘সোশ্যাল ডিসটেন্সিং’ বা সামাজিক দূরত্বের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

কত দিন আমরা এই দূরত্ব বজায় রেখে চলব? আমরা জানি না সংক্রমণরেখা ফ্ল্যাট থাকবে বা পিকে উঠবে কি না। নাকি প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে? আমাদের সবার কোভিড-১৯ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হবে কি না, তা-ও জানি না।

এখন নতুন যেসব ওষুধের কথা শোনা যাচ্ছে, সেগুলো খুব বেশি পরীক্ষিত নয়। অন্যদিকে ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে কোনো টিকা আশা করতে পারি না। এই মহামারি বজায় থাকাকালে টিকা পাব, এমন মনে হয় না।

একটি আলো দেখাচ্ছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। এটি আরএনএ ভাইরাস। বিজ্ঞানীরা এমআরএনএ টিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ভারতের একটি গবেষণা বলছে, এই অঞ্চলে ভাইরাসটি কম মারাত্মক হবে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও কাজ শুরুর অপেক্ষায় আছেন।

র‍্যাপিড টেস্টের প্রসঙ্গ সামনে আসছে। এ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা আছে। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন জরুরি। মাত্র একটি কিটের অনুমোদন আছে যুক্তরাষ্ট্রে। সেই কিট যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যাবে না। ভারতে ১০টা ভিন্ন ধরনের র‍্যাপিড কিট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। গ্লোব বায়োটেক একটি পিসিআর তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, যা দ্রুত ফলাফল জানাবে।

যাহোক, আপাতত ভাইরাস মারার জন্য সাবানই যথেষ্ট। সাবান ভাইরাসের ওপর থাকা লিপিড মেমব্রেন একটা একটা করে ভেঙে ফেলে, তাসের ঘরের মতো। এত বড় শত্রু অল্প পয়সার সাবানের কাছে পরাস্ত হচ্ছে। তাই বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে।

মহামারি থেকে আমরা অনেক কিছু শিখব। আমরা একা কিছু করতে পারব না। সবাই মিলে সবার সঙ্গে কাজ করতে হবে। দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করতে হবে। স্বার্থপর হলে সমস্যার সমাধান হবে না।

Source: Prothomalo

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
২৬৬,৪৪৫
সুস্থ
১৫৩,০৮৬
মৃত্যু
৩,৫১৩

সর্বশেষ

আক্রান্ত
২,৯৯৫
সুস্থ
১,১১৭
মৃত্যু
৪২
সূত্র: আইইডিসিআর

ভাষা সৈনিক চিকিৎসক

নিউজ

মুক্তমত

সংগঠন

হাসপাতাল